Thursday , October 18 2018
Home / বাংলাদেশ / গ্রেনেড হামলার মামলা: শীঘ্রই তারেকের ফাঁসি রায় আসছে ?

গ্রেনেড হামলার মামলা: শীঘ্রই তারেকের ফাঁসি রায় আসছে ?

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জনসভায় বর্বরোচিত ও বহুল আলোচিত গ্রেনেড হামলার মামলার রায় শীঘ্রই হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের চীফ প্রসিকিউটর। শুধু রাষ্ট্রপক্ষই নয়, বিচার প্রার্থী মানুষ অধীর আগ্রহের রায়ের জন্য অপেক্ষা করছেন। ওই হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জনের নির্মম মৃত্যু হয়।

গ্রেনেডের স্প্রিন্টারের আঘাতে আহত হন কয়েক শতাধিক। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেলেও শ্রবণশক্তি হ্রাস পায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ (তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী) আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতেই এই নারকীয় হামলা চালানো হয়। চাঞ্চল্যকর এই মামলায় মোট আসামির সংখ্যা সংখ্যা ৫২ জন। এদের মধ্যে বেশিরভাগই গ্রেফতার আছেন। কয়েকজন মারা গেছেন বাদ বাকি পলাতক রয়েছে। আদালতে ৩১ জন আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন। যারা নির্দোষ দাবি করেছেন এর সমর্থনে আসামি পক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আজ বুধবার। তারা ১২ জনের নাম দিলেও শেষ পর্যন্ত ৬ জনের নাম পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। এই আলোচিত মামলাটি প্রায় শেষের দিকে। এরপর আসামি পক্ষের সাক্ষী প্রদান শেষে মামলার যুক্তিতর্ক শুরু হবে। তারপর রায়ের জন্য দিন ঘোষণা করা হবে।

এ মামলার চীফ প্রসিকিউটর সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেছেন, মামলাটি প্রায় শেষের দিকে। রাষ্ট্রপক্ষ ২২৫ জন সাক্ষী দিয়েছে। সাক্ষীগণ আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণে সক্ষম হয়েছেন। আমি আশা করি শীঘ্রই এ মামলার রায় হতে পারে। আইনমন্ত্রী এ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেছেন, বিচারাধীন বিষয়ে এই মুহূর্তে কিছু বলা যাবে না। তবে এর আগে তিনি সংসদে বলেছেন ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিচার প্রায় শেষের দিকে।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বশূন্য করতে দলের সভাপতি শেখ হাসিনাসহ দলের প্রথমসারির নেতাদের হত্যার উদ্দেশ্যে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে এ ঘৃণ্য হামলা চালানো হয়। বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময়ে মামলাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য জজ মিয়া নাটক সাজানো হয়। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে এসে এই মামলার পুনঃতদন্ত শেষে ৫২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশীট প্রদান করা হয়। এর মধ্যে গ্রেফতার আছে ২৩ জন। ৮ জন জামিনে রয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৮ আসামি পলাতক রয়েছে। মৃত্যুর কারণে মুফতি হান্নানসহ তিনজনকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। আলোচিত এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ৫১১ সাক্ষীর মধ্যে ২২৫ জন সাক্ষ্য প্রদান করেছেন।

মামলার নথি থেকে জানা যায়, মামলাটি প্রথমে তদন্ত করে থানা পুলিশ। পরে তদন্তের দায়িত্ব পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। পরে মামলাটি যায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি)। ২০০৮ সালের ১১ জুন মুফতি হান্নানসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন সিআইডির জ্যেষ্ঠ এএসপি ফজলুল কবির। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে এই মামলাটির তদন্ত ভিন্ন খাতে নেয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠে, যা পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে।

২০০৯ সালের ৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটি অধিকতর তদন্তের আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন। মামলাটি তদন্তের ভার পান সিআইডির পুলিশ সুপার আব্দুল কাহ্হার আখন্দ। তিনি ২০১১ সালের ৩ জুলাই তারেক রহমানসহ ৩০ জনের নাম যুক্ত করে মোট ৫২ জনের নামে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি অভিযোগপত্র দেন।

তবে মামলায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, জঙ্গী নেতা মুফতি হান্নান ও জেএমবির সদস্য শহিদুল আলম বিপুলের মৃত্যুদ- কার্যকর হওয়ায় তাদের নাম বাদ দেয়া হয়েছে। এখন আসামির সংখ্যা ৪৯, যাদের মধ্যে তারেক রহমানসহ পলাতক রয়েছেন ১৮ জন। এছাড়া জামিনে রয়েছেন আটজন ও কারাগারে ২৩ জন। বাকি ১৮ পলাতক আসামির অনুপস্থিতিতেই বিচার কাজ চলছে। একই সঙ্গে পলাতকদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টাও অব্যাহত আছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। একটি হত্যা মামলা ও অপরটি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলা। পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন বিশেষ এজলাসে বিচার কাজ চলছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিকেলে ওই সমাবেশে একটি ট্রাকের উপর অস্থায়ী মঞ্চে যখন শেখ হাসিনা বক্তৃতা দিচ্ছিলেন তখন আকস্মিক এই হামলা চালানো হয়। একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলে মারাত্মক বিশৃঙ্খলা ও ধোঁয়াচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

এ সময় ঢাকা’র তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ হানিফ এবং ব্যক্তিগত দেহরক্ষীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ তাৎক্ষণিকভাবে একটি মানব বলয় তৈরি করে নিজেরা আঘাত সহ্য করে দলীয় সভানেত্রীকে গ্রেনেডের হাত থেকে রক্ষা করেন। তবে গ্রেনেডের আঘাত থেকে বেঁচে গেলেও তার (শেখ হাসিনা) শ্রবণ শক্তির ক্ষতি হয়। এই বর্বরোচিত হামলায় নিহতদের মধ্যে রয়েছেন : প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমান, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অব) মাহবুবুর রশীদ, আবুল কালাম আজাদ, রেজিনা বেগম, নাসির উদ্দিন সরদার, আতিক সরকার, আবদুল কুদ্দুস পাটোয়ারি, আমিনুল ইসলাম মোয়াজ্জেম, বেলাল হোসেন, মামুন মৃধা, রতন শিকদার, লিটন মুনশী, হাসিনা মমতাজ রিনা, সুফিয়া বেগম, রফিকুল ইসলাম (আদা চাচা), মোশতাক আহমেদ সেন্টু, মোহাম্মদ হানিফ, আবুল কাশেম, জাহেদ আলী, মোমেন আলী, এম শামসুদ্দিন, ইসাহাক মিয়া প্রমুখ।
অভিযোগ রয়েছে, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের ব্যাপারে তৎকালীন বিএনপি সরকার নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করেছিল। শুধু তাই নয়, এ হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের রক্ষা করতে সরকারের কর্মকর্তারা ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছে। তবে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে বর্তমানে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটির রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। এখন আসামি পক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ হবে। শীঘ্রই বিচার কাজ শেষ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা।

হাজতি আসামি
বর্তমানে ২৩ জন আসামি কারাগারে আছেন। তারা হলেন মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে অভি, মাওলানা আবু সাইদ ওরফে ডাঃ জাফল, আবুল কালাম আজদ ওরফে বুলবুল, জাহাঙ্গীর আলম হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, শাহাদাত উল্লাহ ওরফে জুয়েল, হোসাইন আহম্মেদ তামিম, মোঃ আব্দুল সালাম পিন্টু, মঈন উদ্দিন শেখ ওরফে আবু জান্দাল, আরিফ হোসেন ওরফে সুমন, রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ, মোঃ উজ্জ্বল ওরফে রতন, মোঃ লুৎফুজ্জামান বাবর, মেজর জেনারেল (অব) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) আব্দুর রহিম, মাওলানা শেখ আব্দুস সালাম, মোঃ আব্দুল মাজেদ ভাট, আব্দুল মালেক ওরফে গোলাম মোস্তফা, মাওলানা আব্দুর রউফ ওরফে পীর সাহেব, মাওলানা সাব্বির আহম্মেদ ওরফে আব্দুল হান্নান সাব্বি, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, আবুল বক্কর ওরফে সেলিম হাওলাদার।

জামিন প্রাপ্ত আসামি

৮ জন আসামি জামিনে আছেন। এরা হলেন, মোঃ আরিফুর ইসলাম ওরফে আরিফ কমিশনার, মোঃ সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা, সাবেক আইজিপি শহিদুল হক, সাবেক আইজিপি খোদা বক্স চৌধুরী, বিশেষ পুলিশ সুপার (অব) রুহুল আমিন, এএসপি (অব) আব্দুর রশিদ, এএসপি (অব) মুন্সী আতিকুর রহমান, লে: কমান্ডার (অব) সাইফুল ইসলাম ডিউক।

১৮ আসামি পলাতক

বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বিএনপি নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন কায়কোবাদ, হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক হানিফ, মেজর জেনারেল (অব) এ টি এম আমিন, লে. কর্নেল (অব) সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার, বাবু ওরফে রাতুল বাবু, আনিসুল মোর্সালীন, তার ভাই মুহিবুল মুক্তাকীন, মাওলানা তাজুল ইসলাম, জঙ্গীনেতা শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, মাওলানা আবু বকর, ইকবাল, খলিলুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে বদর, মাওলানা লিটন ওরফে জোবায়ের ওরফে দেলোয়ার, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক উপ-কমিশনার (পূর্ব) এবং উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) ওবায়দুর রহমান এবং খান সাঈদ হাসান, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিস চৌধুরী।

মৃত্যুজনিত কারণে অব্যাহতি

মৃত্যুজনিত কারণে তিন আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তারা হলেন, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মোজাহিদ (মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদ- কার্যকর) মুফতি আব্দুল হান্নান মুন্সী (ব্রিটিশ হাইকমিশনারের উপর গ্রেনেড হামলায় মৃত্যুদ- কার্যকর), শরীফ শাহেদুল আলম বিপুল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*