Saturday , June 23 2018
Home / বাংলাদেশ / ন্যায্যতা না এলে প্রথম কোপটা পরিবারেই পড়বে

ন্যায্যতা না এলে প্রথম কোপটা পরিবারেই পড়বে

ফটো সাংবাদিক সোমা আর রুবেলের সংসারটা ভেঙে গেলো যেদিন, সেদিন গভীর রাতে ফোন করে হাউ মাউ করে কাঁদছিলো মেয়েটি। সোমার মতো শক্ত মেয়েকে এভাবে কাঁদতে দেখে আমি হতভম্ব হয়েছিলাম। কাঁদতে কাঁদতে বারবার বলছিলো, ‘রুবেল তো জানতো ছবি বানানো আমার শুধু নেশা নয়, আমার পেশাও। তবে ও কেন আমাকে বিয়ে করলো? কেনই বা আবার সব ছেড়ে শুধু সংসার করার জন্য আর বাচ্চা নেওয়ার জন্য চাপ দিলো? ও জানতো আমি আমার সংসারটাকে কতো ভালোবাসি, তিল তিল করে ওই ঘর সাজিয়েছি আমি আমার রোজগারের টাকায়। কিন্তু আজকে কেন এই ভালোবাসা প্রমাণ করতে হবে আমার সবকিছু বিসর্জন দিয়ে?’
ক’দিন আগেই আমরা দেখেছি বাংলাদেশের শীর্ষ নায়িকা অপু বিশ্বাসকে একই রকম প্রশ্ন নিয়ে মিডিয়ার কাছে এসে কাঁদতে। অপু চোখের জলে, নাকের জলে একাকার হয়ে পুরুষের সহানুভূতি কিছুটা পেলেন যাও বা, কিন্তু যখনই বললেন, ‘আমার দায়িত্ব শাকিবকে নিতে হবে না, আমি নিজেই নিজের দায়িত্ব নিতে পারি। আমি শুধু ভাত রান্না করবো না, নিজের যোগ্যতা আমি প্রমাণ করতে জানি’ তখনই এই পুরুষের সমাজের মহান পুরুষরা নড়েচড়ে বসলেন। মিডিয়া রীতিমতো মাইক বাজিয়ে শাকিবের আস্ফালন শুনিয়ে দিলেন আমাদের। টেলিভিশন চ্যানেলে বসে খান বাহাদুর প্রশ্ন তুললো, ‘যে মেয়ে ঘর-সংসার ছেড়ে নায়িকা হতে চায়, যে মেয়ে বাচ্চা রেখে আউটডোর শুটিংয়ে এ যেতে চায়, সে কেমন মেয়ে?’ বটেই তো!
পুরুষ নিয়ন্ত্রিত এই সমাজের প্রতিক্রিয়া এমনই। পারিবারিক অসাম্য বা স্বামীর দমন নিপীড়নের প্রতিবাদ করলে তাকে ‘ঘর ভাঙা’ নারী বলা হয় এ সমাজে। সোমা কিংবা অপু, সবার কান্নার রঙই এখানে এক। কারো কান্নাই কিচ্ছু পরিবর্তন করে না, প্রতিকার নেই। পুরুষের এই সমাজ নারীর কান্না থেকে মজা নেয়, আহা উহু করে, কিন্তু সেই বঞ্চনা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহসকে গ্রহণ করে না। যে নারী পুরুষের ছায়া হতে চায় না, জীবনের সবটুকু সময় স্বামীর ইচ্ছের প্রতিধ্বনি করে খরচ করতে চায় না, তাকে এই সমাজ ভ্রষ্ট বলে। যদি কোনও নারী নিজের জন্যও বাঁচতে চায়, নিজের স্বপ্ন এবং যোগ্যতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ চায়, তাকে উচ্চাভিলাষী আর সংসার বিরোধী বলে। তাই কোনও সোমারা শেষ পর্যন্ত শেকল কাটতে পারলেও কোনও কোনও অপু বিনা শর্তে ঘরের শান্তি রক্ষার সমস্ত দায় মেনে নিয়ে ভরণ পোষণের শান্তির (?) জীবনে ফিরে যায়। এই সমাজ ঘরের শান্তি রক্ষার সমস্ত দায় নারীর ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। সে দায় রক্ষা করতে গিয়ে এ দেশের হাজার হাজার পরিবারে কন্যা শিশুর ভ্রুণ হত্যা চলে, মেয়ে শিশুদের পূর্ণবয়স্ক পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে অপরিপক্ক যৌন সম্পর্কে বাধ্য করা হয়, যৌতুকের জন্য পুড়িয়ে মারা হয়, বিনা কারণে তালাক দেওয়া হয়, চুল কেটে দেওয়া হয়, শারীরিক নির্যাতন করা হয়, হত্যা করা হয়। পুরুষতান্ত্রিক নিয়মে চলা শান্তির সংসারের নমুনা দেখতে পাওয়া যায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে। যেখানে হাত-পা ভাঙা, পাঁজর-ফাটা, মারের চোটে চোখ নষ্ট, ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার, আগুনে ও অ্যাসিডে পোড়া, হাতে-পায়ে-শরীরে ধারালো অস্ত্রের পোঁচ দেওয়া এবং আরও অনেকভাবে আহত নারীরা কাঁতরাচ্ছেন। মর্গে গেলেও দেখা মিলবে নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃতদেহে পরিণত হওয়া নারী শরীর। আহত ও নিহত এই মেয়েদের বেশিরভাগই স্বামী ও শ্বশুরপক্ষীয় আত্মীয়দের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে পুরুষের শান্তি রক্ষা মিশনের পুরুস্কার পেয়েছেন।

মানসিক নির্যাতনও কম কিছু ভয়াবহ নয়। শারীরিক গঠন, গায়ের রং, চেহারা, বাবার বাড়ির আত্মীয়দের নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, কটাক্ষ, গালাগাল, অন্য কারও সঙ্গে অপমানকর তুলনা করা, সময় না দেওয়া, সন্দেহ করা, চরিত্র নিয়ে কথা বলা, চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা, অনাবশ্যক জবাবদিহিতা ইত্যাদি বহু রকম মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েও নারীরা শুধু পরিবারের শান্তি রক্ষা করে যাচ্ছে। অনেক সময় মানসিক নির্যাতনের শিকার নারীরা স্ট্রেস নিতে না পেরে আত্মহত্যা করে, বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়, মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে নিজের সন্তানকে পর্যন্ত হত্যা করে। এভাবেই  পরিবারের শান্তির মাশুল দিতে গিয়ে শিক্ষিত সমাজের অনেক নারীর পরিণতি হয় রুমানা মঞ্জুর, বনশ্রীর মাহফুজা কিংবা আখতার জাহান জলির মতো।

পুরুষের সংসারের শান্তি রক্ষার জন্য উদায়স্ত বিনামজুরীর গৃহস্থালী কাজ করেন মেয়েরা। এখানে আটঘণ্টার হিসেব নেই, বেতন বোনাসের বালাই নেই, ছুটির ঝামেলা নেই, হরতাল অবরোধ নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ( বিবিএস)’র  ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইম্যান সার্ভে ২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্মজীবী নারীরা গৃহস্থালীর কাজে পুরুষের চেয়ে ৩ গুণ বেশি সময় ব্যয় করে। এমন কী কর্মে নিয়োজিত নয় এমন পুরুষের চেয়েও কর্মজীবী নারীর গৃহস্থালী কাজে ৫ গুণ বেশি সময় ব্যয় হয়।

মজার বিষয় হলো, যতক্ষণ পর্যন্ত শান্তি রক্ষা মিশনের নারীরা নিজেদের ওপর ঘটা অন্যায়ের প্রতিবাদ করে না, নিজেদের যোগ্যতা বিকশিত হওয়ার পরিবেশ দাবি করে না, যতক্ষণ পর্যন্ত পুরুষদের ইচ্ছে পূরণ করতে অস্বীকার করেনা ততক্ষণ পর্যন্ত পরিবারে শান্তি থাকে। কিন্তু যখনি মেয়েরা সমতা এবং ন্যায্য অধিকার চাইতে শুরু করে তখনই নাকি পুরুষের শান্তি নষ্ট হয়। যখনই নারীরা যন্ত্রণা, অপমান আর হতাশায় প্রতিক্রিয়া করে তখনই তাকে নারীবাদী বলে আক্রমণ করা হয়। যখনই নারী তার গুরুত্বহীন গার্হস্থ্য জীবন, গৃহকর্মের জীবনে পুরুষের পাপোস হিসেবে ব্যবহৃত হতে অস্বীকার করে তখনই সে হয় পরিবার বিদ্বেষী? আবার আমরা যখন এসব নিয়ে লিখি তখন সমগ্র পুরুষতন্ত্র একযোগে চিৎকার করে আমরা নাকি সব পুরুষকে জেনারালাইজ করি, সংসার পরিবার সব ভেঙে দিচ্ছি।

হ্যাঁ, নারীবাদ নিয়ে পুরুষতন্ত্রের ভয়ঙ্কর অপপ্রচার গুলোর একটি হলো, নারীবাদ নাকি পরিবার প্রথা ভেঙে দিতে চায়। কিন্তু নারীবাদের বিভিন্ন ওয়েভে  বিকল্প পরিবারের বিভিন্ন পরীক্ষা নীরিক্ষার পর আজকের নারীবাদ যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে সেখানে প্রথাগত পরিবারের ত্রুটির পাশাপাশি পরিবারের প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে অনুভূত হচ্ছে। তাই আজকের নারীবাদ পরিবার ভাঙতে চায় না মোটেও, বরং দ্বন্দ্ব ও অসাম্যে পরিপূর্ণ পরিবারগুলোর ওপর থেকে মিথ্যা শান্তির চাদর সরিয়ে সত্যিকারের সুখ শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। নারীবাদ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, বেশির ভাগ পরিবারেই ‘শান্তিপূর্ণতা’ হচ্ছে সামনের ছবি, যার পেছনে অনেক নারীর অনুভূতি, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, আবেগ আর স্বপ্নের ভাঙা টুকরো ছড়ানো থাকে। নারীবাদ সেই ভাঙা টুকরোগুলোকে এক সুতোয় গেঁথে একটি ন্যায্যতার, সমতার, সম্মানের পরিবার গড়তে চায়।

নারীবাদ আজকে যৌক্তিক বিশ্লেষণ করে দেখাতে পেরেছে, অসম পরিবারে শান্তি থাকে না বরং একজনের শান্তি অন্যজনের অশান্তির কারণ হয়। একটি মেয়েটি যদি তার নিজের জীবন নিয়ে নিজস্ব স্বপ্ন ও লক্ষ্য স্থির করে,  সন্তান প্রসব ও পালনের একপেশে দায়িত্বে আটকে থাকতে চায় না, নিজের শিক্ষা আর যোগ্যতাকে প্রমাণ করতে চায়, নিজের জীবনের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ চায়, কিন্তু তার পরিবার ও স্বামী তা দিতে অস্বীকার করবে তখন ঘরের শান্তি নষ্ট করার দোষ আসলে কার? আজকের পুরুষরা যদি পুরনো পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান ধারণা আর প্রত্যাশাকে পরিবর্তন করতে না পারেন, যদি নারীকে তার ন্যায্য অধিকার ও প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতে অস্বীকার করেন তাহলে পরিবারে যে ঝড় উঠবে তার দায়িত্ব কোনভাবেই নারীবাদের বা নারীর নয়, সেই দায় ওই আগ্রাসী পুরুষতন্ত্রের এবং তার বাহক পুরুষের।

এই সত্য মেনে নেওয়ার সময় এসেছে যে, নারীদের ক্ষতি সাধন করে, দমিয়ে রেখে সংসারের শান্তি ও সামঞ্জস্য আর রক্ষা করা যাবে না। কারণ, নারীরা এখন নিজের অধিকার সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন। তারা পুরুষের অধিপত্যকামী আগ্রাসী আচরণকে প্রত্যাখ্যান করছে, নিজেদের ওপর পুরুষের প্রভুত্ব অস্বীকার করছে। ঘর সংসার, যৌনদাসত্ব আর বাচ্চা পালনের একপেশে দায়িত্বের মধ্যে আটকে থাকতে চাইছে না। সুতরাং পারিবারিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পুরুষকে পরিবর্তিত হতে হবে, ন্যায্যতা ও সমমর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে এবং তা শুরু করতে হবে পরিবারের ভেতর থেকেই।

ভারতে স্বদেশী বিপ্লব সফল করার জন্য নাকি একটা কৌশল নেওয়া হয়েছিলো রান্নাঘরে বিপ্লবের বীজমন্ত্র ঢুকিয়ে দেওয়া। আর লিঙ্গ সাম্যের বিপ্লব তো রান্নঘরেই শুরু। একদিন এখান থেকেই সাম্য আসবে। প্রতিটি সচেতন মেয়েই পুরুষতন্ত্রের লক্ষণরেখা ডিঙিয়ে একদিন না একদিন শামিল হবেন সমমর্যাদা আর ন্যায্যতার লড়াইয়ে। সেদিন পুরুষের কাজের জগতে (?) জোরকদমে পা ফেলবে মেয়েরা, আর মেয়েদের গৃহস্থালি কাজে (?) সমানতালে হাত লাগাবে পুরুষরা। সেদিন মাতৃত্ব হবে নারীর সেচ্ছাধীন, সন্তানের ওপর স্বীকৃত হবে নারীর অধিকার, সাম্যের এই সমাজ নারীরও নিজের হবে সেদিন।

আর যদি তা কোনোদিনই না হয় ?

তাহলে জেন্ডার ইনইকুয়ালিটি গ্রাস করবে পারিবারিক শান্তি সুখ। তখন আর রোধ করা যাবে না পারিবারিক অ-সুখ। পুরুষের দমন নিপীড়নের পরিবার ভেঙে বেরিয়ে আসবে মেয়েরা। মেয়েরা যখন বুঝতে শিখেছে, লড়াই করছে লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে, নিজের অধিকারের কথা উচ্চারণ করছে উচ্চকণ্ঠে, তখন ফায়সালা তো একটা হবেই। হয় সমতা ও ন্যয্যতা আসবে নয়তো পারিবারিক অশান্তি আর ঝুঁকিপূর্ণ সম্পর্ক আর হিংসা আর দ্বন্দ্বে বিপন্ন হবে পরিবার। পরিবার থেকেই যেহেতু সবধরনের বৈষম্যের শুরু, তাই সাম্য না এলে, ন্যায্যতা নিশ্চিত না হলে প্রথম কোপটা পরিবারের ওপরই পড়বে। তার জন্য দায়ী থাকবে অবুঝ পুরুষরা আর মগজ ধোলাই হয়ে যাওয়া পুরুষতান্ত্রিক নারীরা। নারীবাদ কোনোভাবেই নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*