Monday , July 23 2018
Home / জাতীয় / পটপরিবর্তনের ৫ মে আজ, আ.লীগ-হেফাজত এক কাতারে

পটপরিবর্তনের ৫ মে আজ, আ.লীগ-হেফাজত এক কাতারে

 ডেস্ক: আজ ৫ মে। অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবিতে ঢাকা অবরোধ, শাপলা চত্বরে অবস্থান, দিনভর তাণ্ডব, রাতে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর অপারেশন ‘সিকিউর শাপলা’ চত্বরের চতুর্থ বর্ষপূর্তি।

হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে ২০১৩ সালের এই দিনে ঢাকা অবরোধ শেষে লাখোমানুষের সমাগম, শাপলা চত্বরে অবস্থান নিলে গভীর রাতে যৌথবাহিনীর অভিযানে ভোরের আলো ফোটার আগেই পুরো এলাকা জনমানব শূন্য হয়ে পড়ে। সেই অভিযানে হেফাজতে ইসলাম তাদের বহু লোক হতাহত হওয়ার দাবি করে। তবে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে সেখানে কেউ মারা যায়নি বলে দাবি করা হয়। পরদিন ৬ মে সকালেও নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামের হাটহাজারীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিছিন্ন সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন নিহত হয়।

সংবিধানে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপন, কুরআন ও মহানবী (সাঃ)-এর অবমাননাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করে আইন পাস, নাস্তিক-মুরতাদ ব্লাগারদের গ্রেফতার ও শাস্তি দাবি, নারী ও শিক্ষানীতি সংশোধনসহ ১৩ দফা দাবির ধারাবাহিক আন্দোলনের অংশ হিসেবেই হেফাজতে ইসলাম ওই দিন ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি পালন করে।

দিনটি স্মরণে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও ঢাকা, চট্টগ্রাম, হাটহাজারীসহ সারা দেশে দোয়ার কর্মসূচি পালিত হবে। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ এই তথ্য জানান।

এদিকে সম্প্রতি বাংলাদেশে নাস্তিকতা, নারী নীতি ও শিক্ষা নীতি-বিরোধী আন্দোলনের পর এবার সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য অপসারণের দাবি তুলে নতুন করে আলোচনায় এসেছে হেফাজতে ইসলাম। অতীতে সংগঠনটি যে ১৩-দফা দাবি তুলেছিল তা নিয়ে দেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। ওই ১৩ দফার মধ্যে ইসলাম অবমাননা ও কটূক্তিকারীদের মৃত্যুদণ্ডের আইন, দেশে ভাস্কর্য স্থাপন নিষিদ্ধ এবং শিক্ষানীতি বাতিলের দাবি ছিল উল্লেখযোগ্য।

এছাড়া ২০১৬ সালে পাঠ্যবইয়ে ১৭টি বিষয় সংযোজন ও ১২টি বিষয় বাতিলের সুনির্দিষ্ট দাবিতে আন্দোলন করেছিল সংগঠনটি। ২০১৭ সালে নতুন পাঠ্যবই প্রকাশের পর দেখা গেছে এসব সংযোজন-বিয়োজন করা হয়েছে।

গত ১১ এপ্রিল কওমি মাদরাসা শিক্ষা সনদের স্বীকৃতির দিয়ে কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ক্লাস দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যার মাধ্যমে নিজেদের দীর্ঘ দিনের দাবি আদায় করতে সমর্থ হয় সংগঠনটি। এ জন্য হেফাজতে ইসলাম প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদ‌ও জানিয়েছে।

ইসলামপন্থী এ সংগঠনের বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে সরকারের অবস্থান প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ. টি. ইমাম বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে বলেন, “রাজনীতিতে বলুন, সরকার পরিচালনায় বলুন সবসময়ই ছোটখাটো অনেকসময় আপোষ করতে হয় বৃহত্তর স্বার্থে। যেমন, এর আগে নারী নীতি নিয়ে কথা হয়েছিল তখন আমি নিজেই আলেম ওলামাদের সঙ্গে বসেছি, তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছি। এরপর শিক্ষানীতি নিয়ে যখন কথা হয়েছে তখন আমাদের সরকারের থেকে ক্যাবিনেটেই সিদ্ধান্তই নেয়া হয়েছে যে, এই নীতিমালাগুলোতে এমন কিছুই থাকবে না যেটি শরিয়া পরিপন্থী, কোরান হাদিসের পরিপন্থী। আসলে থাকেওনি। তার ফলে বিষয়টিকে বলতে পারি ডিফিউজ করা হয়ে গেছে, না হলে এটা একটা খারাপ রূপ ধারণ করতে পারতো। ঐ সুযোগটি তো আমরা তাদের দেবো না।”

বাংলাদেশে ধর্মীয় কারণে হেফাজতের দাবি এবং এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তগুলো স্পর্শকাতর। হেফাজতের সঙ্গে দেশের অধিকাংশ ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের সংশ্লিষ্টতার কারণে সংগঠনটিকে সরকারের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হয় কিনা এ প্রশ্নের জবাবে আলী ইমাম বলেন, “দেখতে হবে যাতে এমন কোনো অবস্থানে তারা না যায় রাষ্ট্রীয় কাঠামোই বিপন্ন হয়। এরা তো দেশে কোনো কালেই হালে পানি পেতো না। এদের পুনঃস্থাপন করা হয়েছিল।”

তিনি আরো বলেন, ‘জামায়াত ইসলামের বড় নেতাদের, যাদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ফাঁসিও হলো এই লোকজনদের এদেশে আনা হয়েছিল, পুনঃস্থাপন করা হয়েছিল, পুনর্বাসন করা হয়েছিল। ব্যবসা বাণিজ্য সবকিছু তাদের হাতে। এখন আপনি দেশের যেখানে যান রন্ধ্রে রন্ধ্রে তারা ঢুকে পড়েছে।‘

এখন আদালত চত্বরে ভাস্কর্য নিয়ে হেফাজতের দাবিতে সরাসরি সমর্থন না জানালেও সরকার এবং ক্ষমতাসীন দলের অনেকেই এই ভাস্কর্য স্থাপন অপ্রয়োজনীয় ছিল বলে মনে করেন। বিষয়টিকে স্পর্শকাতর উল্লেখ করে এ ব্যাপারে সরকার এবং আওয়ামী লীগের কেউ কোনো মন্তব্যও করছে না।

পাঠ্যবইয়ে হেফাজতের দাবির প্রতিফলন এবং তাদের বিভিন্ন দাবির প্রতি সরকারের অবস্থান নিয়ে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বিবিসিকে বলেন, হেফাজতের দাবি অযৌক্তিক এবং বাংলাদেশের অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। যদি বিএনপি এই সমস্ত দাবি তুলতো বা বিএনপি যদি রাজপথে আসতো, তাদের প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি হতো, সেই দৃষ্টিভঙ্গি এদের প্রতি না। এদেরকে প্রশ্রয়ই দেয়া হচ্ছে। কেননা মনে করা হচ্ছে নির্বাচনে এরা আওয়ামীলীগকে সমর্থন করবে এবং এদের সমর্থনটা তাদের জন্য প্রয়োজন। এবং এরা শান্ত থাকলে সুবিধা, শান্ত না থাকলে এরা উগ্র হয়ে পড়বে।’

এদিকে, ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হেফাজতে ইসলামের প্রতি ধর্মীয় কারণে সাধারণ মানুষের ব্যাপক আবেগ এবং সমর্থন দেখা যায়। তবে ৫ই মে ঢাকায় অবস্থান নিলে তখন সরকার কঠোর অবস্থানে যেতে বাধ্য হয়। ভবিষ্যতে সরকার বিরোধীরা যেন সংগঠনটিকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা নিতে না পারে সেজন্য সরকার সংগঠনটির সঙ্গে যে সতর্ক এবং সুসম্পর্ক রাখতে চায় সেটিও এখন অনেকটা স্পষ্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*