Sunday , August 19 2018
Home / বাংলাদেশ / রংপুর বিভাগ / পীরগঞ্জে এক শিক্ষক ২৫ বছর ধরে অন্ধকার ঘরে, শরীরে পঁচন

পীরগঞ্জে এক শিক্ষক ২৫ বছর ধরে অন্ধকার ঘরে, শরীরে পঁচন

মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে, একটু সহানুভ’তি কি- মানুষ পেতে পারে না! ভূপেন হাজারীকার গাওয়া স্বরণীয় এ গানটি একজন অসহায় শিক্ষকের জীবনেই যেন প্রযোজ্য।

গৃহ পালিত পশু-পাখিকেও মানুষ পরিচর্যা করে। কিন্তু মানুষ হয়ে মানুষের সে পরিচর্যাটুকুও নেই। যে ঘরে বসবাস সে ঘরেই খাওয়া দাওয়া, প্রসাব-পায়খানা। স্যাত স্যাতে ঘরের মেঝেতে অসংখ্য ইঁদুরের গর্ত। ইঁদুরের মাটিতে পুরো মেঝে ভরে গেছে। সারা ঘর আর বারান্দায় ছিড়িয়ে ছটিয়ে মানুষের মল। ঘরের এককোণে পুরনো ১টি চৌকি, পাশেই ভাঙ্গা টেবিল। টেবিলে উপর অপরিস্কার ১টি থালা, বাটি ও ১টি গ্লাস।

সকাল থেকে পড়ন্ত বেলা পর্যন্ত খাবার যে পেটে যায়নি সহজেই বুঝা যাচ্ছিল। চৌকির উপর বিছানো তোষক এবং পরিধেয় কাপড়গুলো যেমন- ১াট পুরনো লুঙ্গি, ১টি ছেঁড়া প্জাাবী ও ১টি পাতলা কম্বল কত বছর ধরে যে ধোলাই হয়নি তা ময়লার পুরুত্ব দেখেই বুঝা যাচ্ছে। চারপাশেই বিদ্যুতের আলো কিন্তু আলো নেই শুধু ঐ কুড়ে ঘরটিতে। বৈদ্যুতিক আলো দুরের কথা, নেই কেরসিন কুপির ব্যবস্থাও। জানালা, দরজা ভাঙ্গা ঘরটি যেন তেলাপোকা, ইঁদুর, কেঁচো আর নানা সরীশৃপের অভয়াশ্রম।

ঝড়-বৃষ্টি, শীত, গরম উপেক্ষা করে সেই অন্ধকার মাটির ঘরেই বসবাস করছেন পীরগঞ্জের চৈত্রকোল ইউনিয়নের ঝাড়ামবাড়ী গ্রামের মৃত অমির উদ্দিনের পুত্র মানষিক ভারসাম্যহীন আব্দুল জলিল মাষ্টার (৭২)। এলাকাবাসীর কাছে তিনি পাগলা জলিল নামেই পরিচিত। খেয়ে না খেয়ে একে একে ২৫ বছর কেটে গেছে তার সেই অন্ধকার মাটির কুড়ে ঘরেই। অবহেলিত ও অসহায় এ শিক্ষকের কেউ কোন খোঁজ রাখেনি।

প্রতিবেশীরা জানায়, ঘর আর বারান্দা ছাড়া কখনো কোত্থাও বের হননা তিনি। কারো সঙ্গে কথা বলাতো দুরের কথা, কোন জন-মানবের আনা গোনা বা আভাস পেলেই ঘরের দরজা লাগিয়ে নিজকে লুকিয়ে রাখেন। কি যেন এক অজানা আতঙ্ক তাকে সারাক্ষণ তাড়া করে। প্রায় ৫/৬ বছর পূর্বে এক ঈদের দিনে গা-গোসল হয়েছিল, তারপর আর গা-গোসল হয়েছে কি না তার সঠিক তথ্য কোন প্রতিবেশীই দিতে পারেননি। তার শরীর ও ব্যবহৃত কাপড়গুলো নোংরা ও ময়লায় জরাজীর্ণ। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে থাকতে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ঘা- পঁচন ধরেছে। নেই চিকিৎসার ব্যবস্থা। একজন মানুষ গড়ার কারিগর খ্যাত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এ শিক্ষকের করুণ পরিণতি, অতি কষ্টের-যন্ত্রণার।

প্রতিদিন একবেলা খাবার দিত তারই খালাত ভাই আব্দুল খালেক। তিনি যদি জরুরী কাজে বাড়ির বাহিরে যান, সেদিন ঐ একবেলা খাবারও তার ভাগ্যে জোটেনা। না খেয়ে থাকলেও তিনি কখনো কারো কাছে খাবার চাইতেন না বা ঘর থেকে বের হতেন না। অপর খালাত ভাই মনোয়ার হোসেন নয়া মিয়া জানান, তাকে কয়েকবার চিকিৎসার জন্য রংপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কিন্তু সে নিজেই চিকিৎসা নিতে চাননা। পালিয়ে আসেন।

আব্দুল জলিল মাষ্টার দুই ভাই চার বোনের মধ্যে তৃতীয়। বড়ভাই আজিজার রহমান ১৯৭১ সালে পাক-হানাদার বাহিনীর হাতে নিহত হন। বড়বোন সাফিয়া বেগম ও সাবেরন নেছা অনেক আগে মারা গেছেন। বেঁচে আছেন ছালেহা বেগম ও ফেরদৌসী বেগম। ভাগ্নে-ভাগ্নি ও বোনেরা মাঝে মধ্যেই তাকে দেখতে আসেন। কিন্তু জলিল মাষ্টার তাদের কোনভাবেই পাত্তা দিতেন না। এমনকি কোন কাপড়-চোপড় বা খাবার নিয়ে এলেও তা ছুড়ে ফেলে দিতেন।

পৈত্রিক সূত্রে ও তার ক্রয়কৃত মোট ৬/৭ বিঘা ফসলি জমি এখন ভাগ্নেরা ও খালাত ভাই আব্দুল খালেক আবাদ করেন। তার বিনিময়ে ভাগ্নেরা কোন কিছু না দিলেও খালাত ভাই আব্দুল খালেক বেঁচে থাকার জন্য আব্দুল জলিল মাষ্টারকে একবেলা খাবারটুকু দেন।

তিনি ১৯৭২ সালে রংপুর কারমাইকেল স্কুল এন্ড কলেজ থেকে স্নাতক পাশ করেন। ঐ সময় আশপাশের দু’চার গ্রামের মধ্যে তিনিই একমাত্র স্নাতক ডিগ্রীধারী। ১৯৭৩ সালে তিনি উপজেলার চৈত্রকোল ইউনিয়নের পালগড় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে ৫ বছর চাকুরীর পর বাড়ির পাশ্বে খাসতালুক সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। এর আগে আব্দুল জলিল মাষ্টার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই সংসার ভেঙ্গে যায়। ২য় বিয়ে করেও স্থায়ী হয়নি সংসার। এর পর থেকেই তিনি ধীরে ধীরে মানষিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। আর তারপর থেকেই নিজে নিজকে অন্তরীন করে রেখেছেন চার দেয়াল বেষ্টিত অন্ধকার মাটির কুড়ে ঘরে। কেটে গেছে অমানবিকভাবে ২৫ বছর।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কমল কুমার ঘোষের সাথে কথা হলে বলেন, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আপনার কাছেই জানলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*