Wednesday , August 15 2018
Home / বাংলাদেশ / রংপুর বিভাগ / বাল্যবিয়ে মুক্ত লালমনিরহাটে বাল্যবিয়ের হিরিক

বাল্যবিয়ে মুক্ত লালমনিরহাটে বাল্যবিয়ের হিরিক

লালমনিরহাট প্রতিনিধি:
কয়েক বছর আগেই লালমনিরহাটকে বাল্যবিয়ে মুক্ত ঘোষনা করা হলে সাম্প্রতি বহুগুনে বেড়েছে বাল্যবিয়ের প্রবনতা। কলেজ তো দুরের কথা ৮ম শ্রেণি পাশ না করতেই স্বামীর সংসারে যেতে বাধ্য হচ্ছে এ অঞ্চলের মেয়েরা।
এ কাজে ছাত্রীর পরিবারের চেয়ে ঘটক ও নিকাহ রেজিস্টাররা বেশি আগ্রহী বলে দাবি স্থানীয়দের। ইতিপূর্বে বাল্যবিয়ের দায়ে ভ্রাম্যমান আদালতে অনেকের জেল জরিমানা হয়েছে। কারাদন্ড থেকে বাঁচতে পারেনি নিকাহ রেজিস্টার কাজিরাও। সাম্প্রতিক সময়ে বাল্যবিয়ে নিরোধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ তেমন একটা না থাকায় বাল্যবিয়ের হিরিক পড়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
২০১৪ সালে ৩০ নভেম্বর ৮ম শ্রেনীর ছাত্রীর বাল্যবিয়ে রেজিস্ট্রির প্রস্তুতি নেয়ার অপরাধে দলগ্রাম ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্টার কাজি আবু হানিফাকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড প্রদান করেন ভ্রাম্যমান আদালতের বিচারক তৎকালীন কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা( ইউএনও) গোলাম রাব্বী। সেই সাথে ওই নিকাহ রেজিস্টারের লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশও করেন তিনি। রহস্যজনক ভাবে সেই চিঠি আজ অবধি লাল ফিতায় আটকে আছে জেলা রেজিস্টারের কার্যালয়ে।
এতকিছুর পরও অদৃশ্য শক্তির জোরে কাজি আবু হানিফ দেদারচে চালাচ্ছেন বাল্যবিয়ে। গত ১৭মে দলগ্রামে ৯ম শ্রেনীর ছাত্রীর বিয়ের খবরে ভ্রাম্যমান আদালত মেয়ের বাবার এক হাজার টাকা জরিমানা করেন। এর ৫দিন পরই সেই বাল্যবিয়েটিও রেজিস্ট্রি করেন কাজি হানিফ। গত ১৭ সেপ্টেম্বর দঃ দলগ্রামের ৯ম শ্রেনীর ছাত্রী মারুফার বাল্যবিয়ে রেজিস্ট্রি করেন তিনি।
কাজি হানিফের বড় শক্তি জেলা রেজিস্টার সরকার লুৎফুল কবির। টাকা হলে যেখানে সাতখুন মাপ। কাজ যাই হোক প্রতিটি কাজিকে বার্ষিক আয়ের ১০/১৫ শতাংশ টাকা উপঢৌকন দিতে হয় জেলা রেজিস্টারকে। এতে ভুয়ারাও জাল জালিয়াতি থেকে বেঁচে যান। অন্যথায় হয়রানীর খড়গ নামে বলে একাধিক নিকাহ রেজিস্টার দাবি করেছেন।
শুধু হানিফে নয় টাকা বিনিময়ে রাতারাতি নিয়োগও পাচ্ছেন ভুয়া কাজি। জেলায় বেশ কিছু নিকাহ রেজিস্টারের লাইসেন্স জাল রয়েছে বলে একাধিক নির্ভরযোগ্য সুত্র দাবি করেছে। পাটগ্রাম পৌরসভার নিকাহ রেজিস্টার মামুনুর রশিদের লাইসেন্স জব্দ না করেই জাল বলে জেলা রেজিস্টারের নির্দেশে আদালতে মামলা দিয়েছেন পাটগ্রাম সাব রেজিস্টার সবুজ মিয়া। মামলায় হাজতবাস করার পর মোটা অংকে টাকার বিনিময়ে বাদি বিবাদির সমঝোতার ফলে আদালতে উপযুক্ত প্রমানাদি পেশ করেন নি বাদি। ফলশ্রুতিতে জামিনে মুক্তিপান কাজি মামুনুর রশিদ।
পাটগ্রাম পৌরসভার নিকাহ রেজিস্টার কাজি ইউনুস ও কাজি আনোয়ার হোসেন ৩/৪ বছর ধরে বিবাহ রেজিস্ট্রি করে আসলেও তাদের বৈধ কোন কাগজপত্র নেই। কোন কাগজপত্র পৌরসভায়ও নেই বলে জানান মেয়র শমসের আলী। জেলা রেজিস্টার নিজে এ দুই নিকাহ রেজিস্টারের নিয়োগ পরীক্ষার কোন দলিল দেখাতে না পারলেও তাদের বৈধ দাবি করেছেন। মোটা অংকে টাকার বিনিময়ে জেলা রেজিস্টারের নেতৃত্বে আগের তারিখে স্বাক্ষর দিয়ে জালকে ভাল বানানোর চেষ্টা চলছে। তবে দু’জন সদস্য অাগের তারিখে স্বাক্ষরে অসম্মতি জানায় কাজটি সম্পন্ন করতে পারেন নি বলে নির্ভরযোগ্য সুত্রের দাবি।
আদিতমারীর দুর্গাপুর ইউনিয়নের ৯ বছরের নিকাহ রেজিস্টার মাহমুদুল হাসানের কাছ থেকে বার্ষিক আয়ের ১০ শতাংশের উপঢৌকন না পাওয়ায় পুর্বের কাজির কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে না নিয়ে তদস্থলে রাতারাতি শরিফুল ইসলাম নামে একজনকে কাজি নিয়োগ দিয়েছেন জেলা রেজিস্টার। এ নিয়োগ নিয়ে আদালতের স্থগিতাদেশ থাকলেও তা আমলে নেয়া হয় নি। সারা দেশে নিকাহ রেজিস্টার নিয়োগে প্রয়োজন না হলেও এই একমাত্র নিয়োগ যেখানে বলা হয় মহামান্য রাস্ট্রপতির আদেশক্রমে এ নিয়োগ দেয়া হলো। কিন্তু ওই শরিফুলের যোগদানপত্র বা নিজ নামে নেই ভলিয়ম বহি তবুও তিনি বিবাহ রেজিস্ট্রি করছেন। বর্তমানে এ ইউনিয়নে দু’জনই নিজেকে বৈধ্য কাজি দাবি করছেন। সবমিলে এ নিয়োগটি নিয়েও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছেন জেলা রেজিস্টার সরকার লুৎফুল কবির। তার এ কাজের প্রধান সহায়ক তার অফিস সহকারী মনিরুজ্জামান। যাকে চাকুরী জিবনের ১৩ বছরেও লালমনিরহাটের বাহিরে কেউ বদলী করতে পারেন নি।
এতেই শেষ নয়, ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্টার কাজি এজাজুল ইসলাম বিধিবহির্ভুত ভাবে একই সঙ্গে দুই স্থানে সম্মানী ও বেতন ভোগ করছেন। কাজির পাশাপাশি তিনি ভেলাবাড়ি দাখিল মাদরাসার অফিস সহকারী হিসেবে বেতন ভাতাদি ভোগ করছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি আত্নীয় স্বজন ও বন্ধদের হাতে ভলিয়ম বহি দিয়ে নিকাহ রিজিস্ট্রি করছেন। যার ফলে এ ভায়া কাজিরা আইনের তোয়াক্কা না করে বাল্যবিয়ে রেজিস্ট্রি করছেন। এমন অভিযোগ জেলার প্রায় ১০/১২জন কাজির বিরুদ্ধে।
এমন ভাবে ভুয়া আর জাল জালিয়াতিতে ভরে উঠেছে নিকাহ রেজিস্টারের মত গুরুত্বপুর্ন দফতরটি। ভুয়া কাজিরাই গোপনে রাতে অাঁধারে বে-সরকারী ভলিয়মে চালিয়ে যাচ্ছেন বাল্যবিয়ে। ফলে স্থানীয় সচেতন মহল বা প্রশাসন চেষ্টা করেও বাল্যবিয়ে থেকে রক্ষা করতে পারছে না স্কুল মাদরাসার শিক্ষার্থ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*