Saturday , June 23 2018
Home / জীবনযাপন / যমজ বৃত্তান্ত…

যমজ বৃত্তান্ত…

ভাইবোন যাদের আছে, শুধু তারাই বোঝে যে জীবনটা কত আনন্দের হতে পারে। সেই ভাই-বোন যদি হয়ে থাকে যমজ অর্থাৎ টুইন তাহলে আনন্দ ও মজাটা হয় আরো দ্বিগুণ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এদের মধ্যে মিল থাকে বেশি। এদের একজন চঞ্চলমতি ও দুরন্ত স্বভাবের, তো অন্যজন হয় একটু নরম স্বভাবের। মূলত এ ভিন্ন নরম স্বভাবের যমজই ধরে রাখে অপর চঞ্চলমতি যমজকে। তার সব ভুলত্রুটি, খুনশুটি ও দুষ্টামিগুলো সর্বদা ঢেকে ও সামলিয়ে চলতে হয়, এই নরম ও ধৈর্য্যশীল টুইনকে।
সাধারণ ভাইবোনের সম্পর্ক বেশ আনন্দের ও সৌহার্দ্যপূর্ণ হলেও, এই ব্যতিক্রমী ভাইবোন যারা দেখতে হুবহু একই রকম, তাদের মধ্যকার সম্পর্কটা বাইরের সবার কাছেই বেশ মজার ও আকর্ষণীয়। যদিও তাদের মধ্যকার সম্পর্কটা বেশ লোভনীয় মাত্রায় নির্ভরশীলতা ও বিশ্বাসের এক বন্ধন। এ দু’জন একই চেহারার ও কণ্ঠের হওয়াতে পরিবারের বাইরের মানুষরা তাদের পৃথকভাবে শনাক্ত করতে তেমন পারেই না। আরো তারা যদি সর্বদা একই পোশাক পড়ে, তাহলে কে কখন এসেছিল বা গিয়েছিল, অথবা কেউ বা কার হয়ে কাজ করে চলে গেল তা ধরা বা বোঝা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। সাধারণত দুষ্টচিন্তার যমজেরাই তাদের একই চেহারার এ ধরনের সদ্ব্যবহার করে থাকেন। যেমন স্কুল-কলেজের উপস্থিতি, বন্ধু মহলের সম্পর্ক, প্রেমিক-প্রেমিকার ডেটিংয়ে প্রক্সি ও আত্মীয়-স্বজনদের এটেন্ড করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে। তবে প্রেমিক-প্রেমিকার ক্ষেত্রে তো থাকে আরেক বিরক্তিকর কিন্তু বেশ মজার বিষয়। এ ক্ষেত্রে যদি যুগলের কোনো এক পক্ষ যমজ হয়, তবে বিপরীত ব্যক্তির জীবনটাই মাঠে মারা পড়বে। কারণ যমজের দুষ্টমিষ্টি সব ধরনের এক্সপেরিমেন্ট চলতে থাকে সে প্রেমিক বা প্রেমিকার ওপর। আর যদি তাদের একজন কেউ না যানে যে তার প্রণয়ী যমজের একজন, তাহলে তার জীবনে নাজেহালের আর শেষ থাকে না। ভিন্ন রকম বিড়ম্বনায় ভুগতে হয় সারাটা জীবন।
ছোট থেকেই যমজেরা বেশ মিলেমিশে চলে। তবে পরিবার থেকে তাদের সমদৃষ্টিতে না দেখলেই ঘটে বিপদ। যেসব কিছু থেকে একটু বেশি বঞ্চিত হয়, তার রাগ, অভিমান ও শত্রুতা থাকে সীমাহীন। যার প্রমাণ পাওয়া যাবে মহানায়ক উত্তম কুমার ও সুকরিয়া অভিনীত ‘মন নিয়ে’ সিনেমাতে। আবার শাহরুখের ‘বস’ সিনেমায়ও পাবেন তার প্রমাণ। কিন্তু ছোট থেকে সমতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে উঠলে, এ যমজেরা হতে পারে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ যুগল। তাদের মধ্যে থাকে এক কঠিন বন্ধন, বিশ্বাস ও আস্থার সম্পর্ক। যে সম্পর্ক ছিন্ন করা, বা ভাঙন ধরানো দুনিয়ার কারো পক্ষে সম্ভব নয়। যার প্রমাণ মিলবে বিদেশি সিনেমা ‘ধুম-৩’ তে। যেখানে সার্কাস দেখানো যমজেরা প্রেমিকার হাত ছেড়ে সহমরণেও যেতে পিছ-পা হয় না। এতটাই কঠিন যমজদের সম্পর্ক।
আমাদের দেশে আবশ্য এই ননআইডেন্টিফাই টুইনের সংখ্যা খুবই কম। হাতেগোনা কয়েকটা দেখা যায়। তবে ভারতের কেরালার মালাপ্পুরাম জেলার ‘কোধিনি’ নামক গ্রামে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের টুইন্সবার্গ শহরে অসংখ্য টুইনের জন্ম হয়। প্রায় প্রতিটি ঘরেই রয়েছে টুইন। তাদের কাছে টুইন একদম সাধারণ এক বিষয়। যাই হোক , স্বর্গীয় এক সম্পর্ক, ভাইবোনের সম্পর্ক। তাতে আছে কত না আনন্দঘন মুহূর্তের সমারহ। যে মুহূর্তগুলোতে হিংসা-বিদ্বেষ বাদ দিয়ে, তাকে স্বর্গীয় স্নেহ, মায়া-মমতা ও সৌহার্দ্যতায় ভরে রাখাই মানবের জন্য কল্যাণকর। আর তখনই সে সম্পর্ক হবে পৃথিবীতে অমর। আমার দেখা যমজ দুই বৃদ্ধা বোন বেগম রোকাইয়া ও সুমাইয়া ছিলেন। যশোরের জেলা সদরে যাদের জন্ম, বসতি ও জীবনাবসান ঘটেছে। তাদের দেখতাম একজন অসুস্থ হলে দূরে থেকে অন্যজনও অসুস্থ হয়ে পড়তেন। যদিও তারা জেলার দুই প্রান্তের দুই পরিবারের ঘরণী ছিলেন। একজনের জ্বর হলে, খবর নিয়ে দেখা যেত অন্যজনও শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন। এ যেন নাড়ির টান। অথচ সব টুইনদের যে এমনটা ঘটে তা নয়। তবে মায়ের গর্ভে প্রকষ্টগত অবস্থান ও ডিম্বাণুর বিভাজন জনিত বিষয়ের উপরও এগুলো নির্ভর করে।
একটি পরিবারে যদি যমজ ছেলে বা মেয়ে সন্তান থাকে, তবে সে পরিবারের বাবা-মা থেকে সবার জীবনের মুহূর্তগুলো হাসি ও আনন্দে মেতে থাকে। তাদের পোশাক পরিচ্ছদ কিনতেও ভালো সময় যায় তাদের। অন্য দিকে যমজরা বড় হয়ে স্কুল-কলেজ শুরু করলেও তাদের নিয়ে শুরু হয় বেশ মজার এক পরিবেশ। নানা রকম প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় তাদের। মানুষের কৌতূহলের প্রশ্নবান দিন দিন বাড়তেই থাকে। তবে সর্বদা মিলেমিশে থাকা টুইনরা ইচ্ছে করলেই ক্ষতির থেকে বেশি উপকার বয়ে আনতে পারে পৃথিবীর জন্য। তাদের দ্বৈতশক্তিতে যে কোনো বাধা আর বাধা হয়ে থাকতে পারে না। গবেষণায় দেখা গেছে, যমজদের সম্পর্কের মধ্যে সাধারণত যে সমস্যাগুলো তৈরি হয়, সেগুলো পারিবারিকই বেশি।
তার উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় হল- (১) আইডেন্টিটি ক্রাইসিস। পৃথিবীর সবাই চায় নিজের অলাদা পরিচয় ও অস্তিত্বের প্রতিষ্ঠা। কিন্তু এ সম্পর্কে প্রায়ই তা বিঘিœত হয়। (২) প্রতিযোগিতার টানাপড়েন। দুর্বল ও সবল যমজের মধ্যে পরিবারে সর্বক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতার দ্বন্দ্ব তৈরি করা হয়। যেগুলো সব টুইন মানতে পারে না। (৩) ক্যারিয়ার তৈরিতে সম্পর্কের টানাপড়েন। (৪) বন্ধুমহলে ভালো-মন্দের বাছবিচারে হেরে যাওয়া। (৫) জীবন গোছাতে এগিয়ে বা পিছিয়ে পড়লে। (৬) একই মেয়ে বা ছেলে কে যমজের দু’জনেই জীবনসঙ্গী হিসেবে পেতে চাইলে। উল্লেখিত বিভিন্ন কারণে যমজের সম্পর্ক ব্যহত হতে পারে। তাই এ সম্পর্কের সর্ব ক্ষেত্রেই একে অন্যকে বুঝতে পারাটাই জরুরি বিষয়। এতকিছুর পরও সৃষ্টিকর্তার রহস্যময় ও আশ্চর্যের সৃষ্টি এ টুইন। কসমেটিক সার্জারিতে একই চেহারার হাজারো মানুষ করা সম্ভব হলেও। তাদের সম্পর্কটা এতটা মধুর হয় না। যেখানে অন্যের কৌতূহলটাও থাকে কম।
অলিন্দ-নিলয় বা ফাইজা-নাইজা যে নামই রাখা হোক, যমজদের সুন্দর সম্পর্কের প্রতি আকর্ষণ থাকে সারা দুনিয়ার মানুষের। বিস্ময় থাকে সারা জীবন ভরই। একই পয়সার দুইটা পিঠ হয় যমজেরা। তারা অবশ্য ছোট বা বড় যাই হোক, একে অন্যের নাম ধরেই ডাকতে থাকে। এমন কি ছোট বা বড় নিয়েও থাকে সর্বদা মজার ঝামেলা। ছোটটি বড়কে বড় বলে মানতেই চায় না। যদিও সাইন্সে যে বড় সেই ছোট। তারপরও সমাজ দুনিয়ায় আগে জন্মানোকেই প্রাধ্যান্য দিয়ে থাকে। অন্য দিকে নরম স্বভাবের যমজটি হয় চঞ্চলমতিটির সারা জীবনের ছায়াসঙ্গী। যে সঙ্গী পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। স্বভাবে দুই বিপরীত মেরুর বাসিন্দা হলেও এদের মধ্যকার ভালোবাসা, স্নেহ, বিশ্বাস, মনের টান ও নির্ভরতার সম্পর্ক থাকে অটুট। যে সম্পর্ক পৃথিবীর অন্য সব সম্পর্ককে হার মানায় খুব সহজেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*