Sunday , August 19 2018
Home / বাংলাদেশ / রংপুরের সেই পুড়িয়ে দেয়া হিন্দু পল্লী ঠাকুরপাড়ায় শান্তি ফিরেছে

রংপুরের সেই পুড়িয়ে দেয়া হিন্দু পল্লী ঠাকুরপাড়ায় শান্তি ফিরেছে

বিশেষ প্রতিনিধি(রংপুর):
গত বছর রংপুরের আলোচিত বিষয় ছিল সদর উপজেলার খলেয়া ইউনিয়নের ঠাকুরপাড়া হিন্দু পল্লীতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনাটি। সেই ঠাকুরপাড়ার একশ’ হিন্দু পরিবারের মধ্যে কেটে গেছে আতঙ্ক। ফিরেছে শান্তি। রোপিত লাউগাছের সবুজ পাতা মাচাংজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে শান্তির মতো। ছোট ছোট স্বপ্নবোনা সংসারগুলোর সদস্যদের জীবনে এসেছে কর্মচাঞ্চল্য। তবু মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে যায় ক্ষিরোদ রায়ের। তিনি বলেন, ‘সেই দিনের কথা মনে হলে ভয়ে প্রাণ বেরিয়ে যেতে চায়। হঠাৎ হাজার হাজার মানুষের হামলা, বাড়িঘরে আগুন। চৌদ্দ পুরুষের ভিটামাটি এই বাংলাদেশে, ওই দিনের মতো অসহায় কোনোদিন হইনি।’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, আগুনে পুড়ে যাওয়া ক্ষতিগ্রস্ত ১১টি পরিবারকে প্রশাসনের সহায়তায় নতুন করে ঘরবাড়ি তৈরি করে দেয়া হয়েছে। নতুন চুলায় গৃহবধূরা ব্যস্ত দুপুরের রান্নায়। নতুন বই নেয়ার জন্য স্কুলের খাতায় নাম লিখে ফিরেছে শিশু শিক্ষার্থীরা। রোদে শুকাতে দেয়া হয়েছে লেপ-কাঁথা। অস্থায়ী ক্যাম্পের বাইরে কয়েক পুলিশ সদস্য রোদে বসে আছেন। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা ক্ষেতে গেছেন। নতুন ধানের পোয়াল পুঞ্জে কয়েকটি গরু পোয়াল চিবুচ্ছে। বৃদ্ধ নারীরা নাতিদের নিয়ে খেলছেন।

অভিযুক্ত টিটু রায়ের মা ষাটোর্ধ জিতেন বালা বলেন, ‘এলাও বুকখান ধ্কধ্ক করে বাহে। পুলিশ আছে তারপরও।’ অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর থেকে ঠাকুরপাড়ার হিন্দু পল্লীতে সারাদিন পড়ে থাকতেন সদর উপজেলা চেয়ারম্যান নাছিমা জামান ববি। গভীর রাত পর্যন্ত তিনি সময় কাটাতেন হিন্দু পল্লীর আতঙ্কগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে। এখনো ব্যস্ত সময়ের ফাঁকে ছুটে যান সেখানে। সমস্যা শোনেন, ঘুরে দাঁড়াবার সাহস জোগান। অমূল্য, রতন ও ক্ষেতু রায় বলেন, ‘উপজেলা চেয়ারম্যান ববি আপার প্রতি কৃতজ্ঞতা আমরা সব সময় স্বীকার করি। তিনি যা করেছেন তা ভুলার নয়।’

রংপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফুর রহমান জানান, ঠাকুরপাড়ায় অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প রাখার ব্যাপরটি নির্বাহী সিদ্ধান্ত। যতদিন পর্যন্ত ওই হিন্দু পল্লীর বাসিন্দারা নির্ভয় বোধ করবেন না ততদিন পর্যন্ত পুলিশ ক্যাম্প সেখানে থাকবে।
ঘটনাস্থলটি পরিদর্শনে এসেছিলেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদার এমপি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি টিপু মুনশি এমপি, পুলিশের মহাপরিদর্শক শহীদুল হক, জাতীয় পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনার (রাজশাহী) অভিজিৎ চট্টপাধ্যায় প্রমুখ।

উল্লেখ্য, গত বছরের ১১ নভেম্বর জুমার নামাজের পর ওই হিন্দু পল্লীর বাসিন্দা টিটু রায় নিজ ফেসবুক আইডি থেকে ইসলাম ধর্মকে কটাক্ষ করে অবমাননাকর স্ট্যাটাস দেয়ার অভিযোগে ঠাকুরপাড়া হিন্দু পল্লীর বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও হামলার ঘটনা ঘটে। ১১টি হিন্দু পরিবারের বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে হামলাকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এতে একজন নিহত ও আহত হন অর্ধশতাধিক। পুলিশের দায়ের করা দুটি মামলায় গ্রেফতার হয় দুই শতাধিক। এর পর অভিযুক্ত টিটু রায়কে গ্রেফতার করে পুলিশ। আদালতে টিটু রায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। বর্তমানে তাকে জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। গ্রেফতারের ভয়ে ঘরছাড়া পার্শ্ববর্তী মুসলমান গ্রামগুলোতে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*