Sunday , July 22 2018
Home / জীবনযাপন / সুরের মানুষ আড্ডার মানুষ

সুরের মানুষ আড্ডার মানুষ

সংগীতশিল্পী, সংগীত পরিচালক ও সুরকার সুজেয় শ্যাম। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠসৈনিক ছিলেন। খিচুড়ি তাঁর প্রিয় খাবার। মেয়ে রুপোমঞ্জুরির ‘শাসন’ তিনি উপভোগ করেন। সুরের মানুষ আড্ডার মানুষ

সিলেট শহরের কাষ্টগড়ে আমাদের বাড়িতে প্রতিটি সন্ধ্যায় জমে উঠত গানের আসর। গান, আড্ডা আর হাসিতে মেতে থাকত আমাদের একান্নবর্তী পরিবারের সদস্যরা। সেই থেকে সুরের সঙ্গে, গানের সঙ্গে গড়ে ওঠে সখ্য।’ কথাগুলো সুরকার এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠসৈনিক সুজেয় শ্যামের। দেশের বাইরে অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। কিন্তু তাঁর চোখে বাংলাদেশই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দেশ। ‘একবার হলো কি, অনুষ্ঠান করতে বান্দরবান গেলাম। অনুষ্ঠান শেষে আয়োজকেরা কাপ্তাইয়ের অনেক ভেতরের দিকে একটা জায়গায় ঘুরতে নিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে দেখলাম, একই নদীতে বাঘ আর কুমির জল খাচ্ছে। অপরূপ সুন্দর ছিল সেই দৃশ্য!’

ঢাকার মিরপুরের বাসায় যখন সুজেয় শ্যামের সঙ্গে কথা হচ্ছিল, তখন তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সিলেট যাওয়ার। একটা পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সেখানে যাচ্ছেন। প্রয়োজন ছাড়া খুব একটা ঘর থেকে বের হোন না। কারণটা, রাস্তায় যানবাহনের ভিড়। এতে সব সময় আতঙ্ক বোধ করেন তিনি। ‘গাড়িগুলো এমন বেপরোয়া গতিতে চলে যে দেখলেই মনে হয়, এই বুঝি গায়ের ওপর উঠিয়ে দিল। এ জন্য পুরোটা সময় বাড়িতে কাটানোর চেষ্টা করি আজকাল।’

১৯৯৯ সালে মারা যান সুজেয় শ্যামের স্ত্রী ডা. রুমা ঘোষ। এরপর থেকে মেয়ে রুপোমঞ্জুরিকে ঘিরেই চলছে তাঁর জীবন। বাড়ির সদস্য হিসেবে আরও আছেন রুপোমঞ্জুরির স্বামী দীপংকর দে। ‘প্রত্যেক নারীর ভেতরে যে একটা মাতৃসত্তার বাস, সেটা বুঝেছি মেয়েকে দেখে। কোনো কারণে যদি অসুস্থ হয়ে পড়ি, তখন ওর যে দুশ্চিন্তা, সেটা না দেখলে বলে বোঝানো যাবে না। বাইরে কোথাও বের হওয়ার আগে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দেবে। ঢাকার বাইরে গেলে প্রতি ঘণ্টায় ফোন দিয়ে খোঁজ নেবে যে আমি ভালো আছি কি না। আসলে রুপোমঞ্জুরির বাবা না হলে হয়তো জীবনটা অপূর্ণ থেকে যেত আমার।’ বোঝা গেল, মেয়ের এই উদ্বেগ বেশ ভালোভাবেই উপভোগ করেন বাবা।
সিলেটের বাড়িতেপ্রার্থনার মধ্য দিয়েই শুরু হয় সুজেয় শ্যামের প্রতিটিদিন । এরপর সকালের খাবার খেয়ে বেশ কিছুটা সময় ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পত্রিকার সব খবর পড়েন। প্রথম আলোর একজন নিয়মিত পাঠক তিনি। পত্রিকাটি প্রকাশের পর থেকে এখন পর্যন্ত একটি দিন এই পত্রিকা ছাড়া কাটেনি বলে জানালেন তিনি। দুপুরে গোসল শেষে ঘরের ভেতরেই ঘণ্টা খানেক সময় হাঁটাহাঁটি করেন। দুপুরের খাবারের পরের সময়টুকু কখনো হেঁটে, আবার কখনো টিভি দেখে পার করে দেন। ‘এখন ঘুমটা একেবারেই কমে গিয়েছে, বেশির ভাগ সময়টা তাই টিভি চ্যানেলগুলোয় গানের অনুষ্ঠান দেখতে দেখতে কেটে যায়। পাশাপাশি খবর আর টক শো দেখি।’ একটা সময় অনেক বই পড়তেন। এখন আর সেটা হয়ে ওঠে না।
খাবারের মধ্যে ভালোবাসেন খিচুড়ি। আরও পছন্দ নানা পদের নিরামিষ। আগে নিয়মিত প্যান্ট-শার্ট পরলেও এখন পাঞ্জাবি-পায়জামা তাঁর নিত্যদিনের পোশাক। আরেকটা মজার তথ্য জানালেন। শুধু স্যান্ডেলই কেনেন এখন। পোশাক–আশাক কেনার প্রয়োজন হয় না। কারণ, প্রতিবছরই সবার কাছ এত পোশাক উপহার পেয়ে থাকেন যে আলাদা করে আর কেনার দরকার পড়ে না।
সম্প্রতি শেষ করেছেন একাত্তরের ক্ষুদিরাম আর একাত্তরের মা জননী নামে অনুদানপ্রাপ্ত দুটি সিনেমার কাজ। সুজেয় শ্যাম দুটি ছবিরই সংগীত পরিচালক ও সুরকার। হাসান রাজা, জয়যাত্রা আর অবুঝ মন সিনেমার জন্য শ্রেষ্ঠ সুরকার হিসেবে তিনবার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন সুজেয় শ্যাম। আরও পেয়েছেন চ্যানেল আই আজীবন সম্মাননা, ভারত গৌরব সম্মাননাসহ অসংখ্য পুরস্কার। কাজের এত স্বীকৃতি পেলেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এখনো সরকারি কোনো স্বীকৃতি মেলেনি সুজেয় শ্যামের। অবশ্য এ নিয়ে মনের মধ্যে কোনো আক্ষেপ বা দ্বিধা নেই তাঁর।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সুজেয় শ্যামের সুরে ‘বিজয় নিশান’ গানটা বেজেছিল সারা দিন। এ ছাড়া গত বছর ২৬ মার্চ শুদ্ধ সুরে জাতীয় সংগীত গাওয়ার যে আয়োজনটা করা হয়, সেটার সংগীত পরিচালনা করেছিলেন তিনি। সুজেয় শ্যাম বলেন, ‘এই কাজগুলো করার সুযোগ পাওয়ার জন্য তো নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে হয়। দেশে বা দেশের বাইরে কোথাও গেলে মানুষের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পাই, সেটাও কি কম বড় স্বীকৃতি!’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*